বয়ঃসন্ধির সাথে সম্পর্কিত কৈশোরের বিঘ্ন বিপদ ও বিপত্তি – বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “শিশুর মন ও শিক্ষা” সিরিজের “বয়ঃসন্ধি সমস্যা ” বিভাগের একটি পাঠ।
বয়ঃসন্ধির সাথে সম্পর্কিত কৈশোরের বিঘ্ন বিপদ ও বিপত্তি
বয়ঃসন্ধির কালে এবং অনুপরবর্তীকালে শরীরের বাড়-বৃদ্ধি পরিবর্তনের ফলে তাল মিলিয়ে চলা, সত্তোলন রক্ষা করা প্রায়ই কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই বিঘ্নবিপদের সম্ভাবনা দেখা দেয়। এরা ডিপ্রেশন বা হতাশায় ভোগে, ভুগতে পারে। ভুগলে বিপদ হতে পারে। আত্মহনন পর্যন্ত ঘটে যেতে পারে। এই সবের উৎসে থাকে এণ্ডোক্রিন গ্ল্যাণ্ডের অবক্রিয়া— ম্যালফাংশন। বৃদ্ধির হরমোন যদি কম ক্ষরিত হয় তাহলে বৃদ্ধি মার খায়।
যৌন হরমোন অপ্রতুল হলে স্বাভাবিকতা মার খায়, বালসুলভ অবস্থানে অনেকদিন থেকে যেতে পারে অথবা বিপরীত লিংগশ্রেণীর আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা দিতে পারে। আর যদি যৌন হরমোন অধিক পরিমাণে ক্ষরিত হয় তাহলে সময়ের অনেক আগেই আনুষঙ্গিক যৌন বৈশিষ্ট্যগুলি— সেকেণ্ডারি সেক্স ক্যারেকটারিসটিকস্— প্রকট হয়ে উঠতে পারে। আকারে- চেহারায় বালক-বালিকা মাত্র কিন্তু যৌন অবস্থানে ভবিষ্যতটা বর্তমানে দেখা দিয়ে ফেলেছে। অস্বস্তির কারণ হয় ওদের। মানসিক বিপদ ঃ এই বিপদগুলো অনেক বেশি এবং সুদূরপ্রসারী। সেই কারণে অধিক গুরুত্বের।
প্রধান প্রধানগুলি এইরকম >. নিজের অবমূল্যায়ন। বেশির ভাগ বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েরা নিজেদের, আগের তুলনায়, হীন বা অধম মনে করে। মনে করে তারা অনেক অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কিছুটা ঘটে ব্যক্তিগত কারণে, কিছুটা পরিবেশগত কারণে। নিজেদের বিষয়ে অবাস্তব ধারণা, অতিশয় কল্পনা থাকে; আর যা যা ঘটে, যে যে চেহারা-আকৃতিতে নিজেদের খুঁজে পায়— বাস্তবে তা সেই কল্পঅবস্থান থেকে অনেক অনেক ঘাটতিতে ঘটে। তাই মানসিক বিপন্নতা ঘিরে ধরে, অসন্তোষ আক্রমণ করে। আবার পরিবেশের কাছে, অন্যান্যদের কাছে যেমন প্রত্যাশা করে তেমন ব্যবহার- মূল্যায়ন পায় না। নিজেদের দৈহিক-মানসিক অবস্থানের কারণেই এরা একা-একা হয়ে পড়ে, একাত্ খোঁজে। ঠিক অসামাজিক বলা যায় না কিন্তু পূর্বের আচরণের স্বাভাবিক সামাজিকতাও মার খায়।
অন্যান্যদের প্রতিক্রিয়ায়-মূল্যায়নে এরা তাই বিমর্ষ হয়ে পড়ে। নিজেদের হীন, অক্ষম, অন্ত্যজ মনে করে বসে। নিজেদের বিষয়ে বিরূপ ও সংবেদনহীন হয়ে এরা ক্রমশই দূরে সরে যায়— উইথড্রন হয়ে পড়ে— কম কথা বলে অথবা আগ্রাসী— অ্যাগ্রেসিভ— কোটরবাসী প্রতিরোধী মনোভাবের শিকার হয়ে ওঠে। মনে মনে বিদ্রোহী হতে পারে। সব মিলে একটা তাৎক্ষণিক প্রতিযোজনের সমস্যা দানা বেঁধে ওঠে। তার চাইতে বড় বিপদ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। হীনমন্যতা বা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স ঘটে যেতে পারে যা সারাজীবন এদের চরিত্রে-ব্যক্তিত্বে ছায়া ফেলবে। তাই ‘সময়ের একটা ফোঁড় পরের নয়টি ফোঁড় বাঁচাতে পারে’- নীতিটি এখনই প্রয়োগ করা উচিত। মা বাবা ও সন্তানের মধ্যে সেই সেতুটি আছে তো? সহানুভূতি আর ভাবনা চিন্তার লেনদেনের সেতুটি? সেই পথে কাছে পৌঁছালে অনেক মানসিক অঘটন, ভবিষ্যৎ বিপদ পার হওয়ার পথ আছে।
সঙ্গতির অধোগতি বা যোগ্যতার অবপ্রাপ্তি মানসিকতা। শরীর মনের তাৎক্ষণিক অবস্থানের কারণে আলস্য, অনীহা, দুর্বলতা, কোণ-ঠাসা একা-একা জীবন— এই সব মিলে যা ওদের যোগ্যতা তা পূরণে শক্তির বা ইচ্ছার যোগান উৎসটি অবসিত হয়ে যায়। “কিছু আর ভাল লাগে না!’ শরীর মনের অবস্থানের ভিতর-বাহির দ্রুত পরিবর্তনের অভিঘাতে তাল রাখা দায় হয়ে পড়ে। তাই। আর, একবার এই অধোগতি আর অবপ্রাপ্তি পেয়ে বসলে কে বাঁচাবে ওদের? সংসারে, দৈনন্দিন কুশলতায়, স্কুলের লেখাপড়ায়, শ্রেণীমূল্যায়নে, স্বজন পরিজনদের সঙ্গে সামাজিক মেলামেশায় প্রতিক্রিয়ায়-মতামতে সর্বক্ষেত্রেই নিম্নগামিতা এদের চেপে ধরতে পারে। সুপ্ত সম্ভবনার অকালমৃত্যুতে, অথবা ক্রমশ মৃত্যুতে, এদের ক্ষতি অপরিমেয় হয়ে দেখা দেবে দীর্ঘ জীবনের প্রেক্ষিতে। সময় থাকতে সময় দিন; সেতু পথে কাছে যাম, কাছে কাছে থাকুন।
অপ্রস্তুতির অভিঘাতে জর্জরিত বয়ঃসন্ধির অতঃকিম্ কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা। ওরা কয়জনে আগে থেকে জানে, বোঝে? অথবা জানানো হয় বোঝানে৷ হয়? জীবনে যখন যৌন- বন্যার সময় আসে তখন ওরা হচকিয়ে যায়। কার দায়? বোঝানোর এবং প্রস্তুত করে তোলার? দেহে-মনের এই হঠাৎ ধেয়ে আসা বন্যার তোড়ে ওদের অনেকের মনেই ‘ট্রমা’, উদ্বেগ, অভিশঙ্কা বা ত্রাসের সৃষ্টি হয়। ওরা জানে না কী ঘটছে, কেন ঘটছে; মা-বাবাদের অনেকেই ঠিক ঠিক বোঝেন না কী বলতে হবে, কি ভাবে বলা যায়। অস্বস্তি, অযোগ্যতা, ‘সেতু’হীন অবস্থান! অনেক সন্তান তো অনেক জানে বলে মা-বাবাকে বাতিল করে দেয়! ‘বলতে হবে না, জানা আছে!’ এমন হলে বিপদ।
স্কুল? শিক্ষক শিক্ষিকা? বলে লাভ নেই। ওঁদের প্রতি মনোভাব সেই মা-বাবার প্রতি মনোভাবের মতোই হয়ে থাকে। তাছাড়া বই এবং পত্র-পত্রিকা। বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা-বিবরণ, তথ্য-সত্য, অবস্থা-ব্যবস্থা ইত্যদিও তেমন আছে কি? একদল আনকোরা আনপড় তাই একাত্ত হয় আর একদল আনপড়ের কাছে— পিয়ার গ্রুপ বা বন্ধুবান্ধবীদের কাছে। ওরা পূর্বসূরি সেই অভিমান আর সেই ‘প্রজ্ঞা’ দিয়ে ওরা যা বলে এরা তাই গেলে। তারা যে সঠিক জানে না তাও জানে না; অথচ সেই না-জানা দিয়েই ঢেউয়ের পরে ঢেউ হয়ে এগিয়ে আসা কিশোর – কিশোরীদের এরা প্রাজ্ঞ করে তুলছে।
বিপদ অনেক বেশি ঘটে বিলম্বিত যৌনাগম কিশোর কিশোরীদের বেলায়। অনেক ভুলভাল ব্যাখ্যা দিয়ে ওদের বর্তমান চিন্তাকে আর ভবিষ্যৎ জীবনকে প্রভাবিত করে ফেলে। নিজেদের অ-স্বাভাবিক, অ্যাবনর্মাল, অযোগ্য, অক্ষম ইত্যাদি বলে ভাবতে শুরু করে। অকারণ, একেবারেই অকারণ। ফলে এরা মানসিক স্ট্রেন এ্যাও স্ট্রেসের— উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-ব্যাকুলতা-ত্রাসের শিকার হয়ে পড়ে। সত্যে ও তথ্যে ওদের সমৃদ্ধ হতে দিন তাহলেই ওরা জানবে : এই মাত্র? আর কিছু নয়? ঘুচে যাবে ভয়।
